যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেণ্ট নির্বাচন পদ্ধতি

মাসুদ রানা : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি রাষ্ট্রপতি-শাসিত ফেডারাল রিপাবলিক, যেটি ৫০টি ফেডারেইটিং স্টেইট নিয়ে গঠিত। আর, আছে ওয়াশিংটন ডিস্ট্রিক অফ কলাম্বিয়া – সংক্ষেপে ওয়াশিংটন ডিসি – যেটি রাজধানী বলে স্বয়ং কোনো স্টেইট নয়, কিংবা কোনো স্টেইটের অধীনস্থও নয়; বরং কেন্দ্র-শাসিত।

যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভায় রয়েছে দুই কক্ষ। নিম্নকক্ষের নাম হচ্ছে হাউস অফ রিপ্রেজেণ্ট্যাটিভ, এবং উচ্চকক্ষের নাম সেনিট। আর, এ-দু’কক্ষের সম্মিলিত সভাকে বলা হয় কংগ্রেস।

প্রতিটি স্টেইটের জনসংখ্যা অনুযায়ী হাউজ অফ রিপ্রেজেণ্ট্যাটিভে তাদের আসন থাকে, কিন্তু জনসংখ্যা নির্বিশেষে প্রতিটি স্টেইটেরই ২টি আসন থাকে সেনিটে। হাউস অফ রিপ্রেজেণ্ট্যাটিভের সদস্যকে একবচনে বলা হয় কংগ্রেসম্যান ও কংগ্রেসউম্যান এবং বহুবচনে কংগ্রেসমেন ও কংগ্রেসউইমেন। আর, সেনিটের সদস্যকে বলা হয় সেনিটর।

যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি স্টেইটের জন্যে ২টি করে মোট ১০০টি আসন আছে সেনিটে। অন্যদিকে, জনসংখ্যা অনুপাতে বিভন্ন স্টেইটের বিভিন্ন সংখ্যক আসন রয়েছে হাউস অফ রিপ্রেজণ্ট্যাটিভে, এবং এদের মোট সংখ্যা হচ্ছে ৪৩৫।

অর্থাৎ, নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা তথা কংগ্রেসের আসন সংখ্যা হচ্ছে ৫৩৫। উল্লেখ্য, নিম্মকক্ষের প্রতিনিধি নির্বাচিত হন ২ বছরের জন্যে এবং উচ্চকক্ষের সেনিটর নির্বাচিত হন ৬ বছরের জন্যে।

‘চেক-এ্যাণ্ড-ব্যালেন্স’-এর জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি শাখার – লেজিসল্যাটিভ বা আইনসভা, এক্সিকিউটিভ বা নির্বাহী-বিভাগ, ও জুডিশিয়ারী বা বিচার-বিভাগের – মধ্যে আপেক্ষিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা হয় বলে, আইনসভার কোনো সদস্য সরকারের সদস্য হতে পারেন না কিংবা সরকার গঠনেও ভূমিকা রাখেন না। সরকার গঠন করেন নির্বাচিত নির্বাহী প্রেসিডেণ্ট তাঁর বিবেচনায় উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে।

কিন্তু প্রেসিডেণ্ট নির্বাচিত হবেন কাদের দ্বারা? যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা-কালে এ-নিয়ে বিতর্ক ছিলো। একপক্ষের মত ছিলো প্রেসিডেণ্ট নির্বাচিত করবে আইনসভা বা কংগ্রেস। অপরপক্ষের মত ছিলো প্রেসিডেণ্ট নির্বাচিত হবেন সরাসরি জনগণের ভৌটে। কিন্তু বাস্তব চর্চায় প্রেসিডেণ্ট যেমন কংগ্রেসের দ্বারা নির্বাচিত হন না, তেমনি সরাসরি জনগণের দ্বারাও হন না।

যুক্তরাষ্ট্রে ৪ বছরের জন্যে প্রেসিডেণ্ট নির্বাচিত করেন আরেক দল মানুষ, যাদেরকে বলা হয় ইলেক্টর এবং এদের সমষ্টিকে বলা হয় ইলেক্টোর‍্যাল কলিজ। ধারণা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা-পিতাগণ প্রেসিডেণ্ট নির্বাচনে কংগ্রেস বনাম জনগণের ক্ষমতার বিতর্ক নিরসনে একটি আপস ফর্মুলা বের করেন, যা হচ্ছে ঐ ইলেক্টোর‍্যাল কলিজ।

ইলেক্টোর‍্যাল কলিজের আসন সংখ্যা হচ্ছে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষের মোট আসন সংখ্যা ৫৩৫টি এবং তার সাথে রাজধানী ওয়াশিংটন ডিস্ট্রিক অফ কলাম্বিয়ার জন্যে ৩টি নিয়ে মোট ৫৩৮টি। নীচের তালিকায় ইলেক্টোর‍্যাল আসন তথা প্রেসিডেণ্ট নির্বাচনে ৫০টি স্টেইট ও কেন্দ্র-শাসিত রাজধানীর ভৌট-ক্ষমতার বণ্টন দেখানো হলো।

১) Alabama – 9 votes
২) Kentucky – 8 votes
৩) North Dakota – 3 votes
৪) Alaska – 3 votes
৫) Louisiana – 8 votes
৬) Ohio – 18 votes
৭) Arizona – 11 votes
৮) Maine – 4 votes
৯) Oklahoma – 7 votes
১০) Arkansas – 6 votes
১১) Maryland – 10 votes
১২) Oregon – 7 votes
১৩) California – 55 votes
১৪) Massachusetts – 11 votes
১৫) Pennsylvania – 20 votes
১৬) Colorado – 9 votes
১৭) Michigan – 16 votes
১৮) Rhode Island – 4 votes
১৯) Connecticut – 7 votes
২০) Minnesota – 10 votes
২১) South Carolina – 9 votes
২২) Delaware – 3 votes
২৩) Mississippi – 6 votes
২৪) South Dakota – 3 votes
২৫) District of Columbia – 3 votes
২৬) Missouri – 10 votes
২৭) Tennessee – 11 votes
২৮) Florida – 29 votes
২৯) Montana – 3 votes
৩০) Texas – 38 votes
৩১) Georgia – 16 votes
৩২) Nebraska – 5 votes
৩৩) Utah – 6 votes
৩৪) Hawaii – 4 votes
৩৫) Nevada – 6 votes
৩৬) Vermont – 3 votes
৩৭) Idaho – 4 votes
৩৮) New Hampshire – 4 votes
৩৯) Virginia – 13 votes
৪০) Illinois – 20 votes
৪১) New Jersey – 14 votes
৪২) Washington – 12 votes
৪৩) Indiana – 11 votes
৪৪) New Mexico – 5 votes
৪৫) West Virginia – 5 votes
৪৬) Iowa – 6 votes
৪৭) New York – 29 votes
৪৮) Wisconsin – 10 votes
৪৯) Kansas – 6 votes
৫০) North Carolina – 15 votes
৫১) Wyoming – 3 votes

প্রেসিডেণ্ট নির্বাচনের আগে, প্রতিন্দ্বন্দ্বী পার্টিগুলো ৫০টি স্টেইটে ৫৩৫টি ও ওয়াশিংটন ডিসিতে ৩টি ইলেক্টোর‍্যাল আসনের জন্যে মোট ৫৩৮ ব্যক্তিকে ইলেক্টর মনোনীত করে। এই মনোনয়ন কোনো-কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দলের স্থানীয় সম্মেলনে ঠিক হয়, আবার কোনো-কোনো ক্ষেত্রে দলের কেন্দ্রীয় কমিটীর দ্বারা নির্ধারিত হয়। প্রতিটি স্টেইটের প্রতিটি দলের মনোনীত ইলেক্টরদের সমষ্টিকে বলা হয়, স্লেইট (Slate)।

চার বছর পর-পর নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের পরের দিন মঙ্গলবারে প্রেসিডেণ্ট নির্বাচনে সাধারণ ভৌটারগণ তাদের নিজ-নিজ স্টেইটে ভৌট দেন তাদের পছন্দের প্রেসিডেণ্ট প্রার্থীক, কিন্তু সে-ভৌটটি আসলে পান সে-প্রার্থীর দলের মনোনীত ইলেক্টর, যার নাম কোনো-কোনো স্টেইটে ব্যালটপত্রে ছাপা থাকে, কোনো-কোনো স্টেইটে তা থাকে না।

জনগণের ভৌট – তথা পপুলার ভৌট – গণনার ভিত্তিতে ইলেক্টরগণ নির্বাচিত হলেও, যে-পার্টির স্লেইটের (পার্টি-মনোনীত ইলেক্টরগণ) অধিকাংশ ইলেক্টর বিজয়ী হন, সে-পার্টি ইলেক্টোর‍্যাল কলিজে সে-স্টেইটের সবগুলো আসন স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাভ করে। এ-পদ্ধতিকে বলা হয় ‘উইনার টেইকস্‌ অল’ (বিজয়ী সব নিয়ে যায়), যা মেইন ও নেব্র্যাস্কা ছাড়া বাকি স্টেইটে প্রজোয্য।

যদিও নির্বাচনে পপুলার ভৌট গণনা করা হয়, কিন্তু এ-ভৌট কোনো কাজে লাগে না, যদি না একটি স্টেইটের অধিকাংশ আসনে লাভ না করা যায়। কারণ, একটি আসন কম পাওয়া মানে কোনো আসনই না পাওয়া। ফলে, বিজয়টা আসে মূলতঃ স্টেইট-ওয়ারী, এবং বিজয়ী হতে হলে ইলেক্টোর‍্যাল কলিজে ৫৩৮ আসনের মধ্যে ন্যুনতম ২৭০ আসন পাওয়া প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, কোনো প্রার্থী যদি ইলেক্টোর‍্যাল কলিজে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন না পান, কংগ্রসের নিম্নকক্ষ হাউস অফ রিপ্রেজেণ্ট্যাটিভের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভৌটে প্রেসিডেণ্ট, এবং উচ্চকক্ষ সেনিটের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভৌটে ভাইস-প্রেসিডেণ্ট নির্বাচিত হওয়ার সাংবিধানিক বিধান রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেণ্ট নির্বাচনে ইলেক্টোর‍্যাল কলিজ পদ্ধতির কারণে, ২০১৬ সালের নির্বাচনে রিপাবলিক্যান পার্টির প্রেসিডেণ্ট-প্রার্থী ডৌন্যাল্ড ট্রাম্পের প্রাপ্ত ৪৬.৪% ভৌটের বিপরীতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টীর প্রার্থী হিলারি ক্লিণ্টন ৪৮.৫% ভৌট পেয়েও নির্বাচিত হতে পারেনি।

যাহোক, এবার ২০২০ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রেসিডেণ্ট ডৌন্যাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে পপুলার ভৌট যেমন বেশি পয়েছেন, ইলেক্টোর‍্যাল কলিজেও বেশি আসন পেয়েছেন। বাইডেনের পপুলার ভৌটের সংখ্যা ৭৫,১৯৩,০২২ এবং ইলেক্টোর‍্যাল আসন ২৯০। অন্য দিকে ট্রাম্পের ভৌটের সংখ্যা ৭০,৮০৪,৯৬৮, এবং ইলেক্টোর‍্যাল আসন ২১৪।

উল্লেখ্য, ইলেক্টোর‍্যাল কলিজে ২৭০ বা ততোধিক আসন-পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হলেও, তত্ত্বগতভাবে প্রতিটি স্টেইটে ইলেক্টরদের ভৌট দান এবং সকল স্টেইটের ভৌট একত্রে কংগ্রেসে গণনা করে ভাইস-প্রেসিডেণ্ট কর্তৃক বিজয়ী প্রেসিডেণ্ট ও ভাইস-প্রেসিডেণ্টের নাম ঘোষণা না-করা অবধি নির্বাচন প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থাকে।

আর, এদিকে হেরে-যাওয়া প্রেসিডেণ্ট ডৌন্যাল্ড ট্রাম্প জো বাইডেনের বিজয়কে কারচুপির ফল বলে প্রত্যাখ্যান করে আদালনে মামলা দায়ের করবেন জানিয়েছেন।

দেখা যাক বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের স্বঘোষিত রক্ষক হিসেবে কোথাও নির্বাচিত সরকারে বিরুদ্ধে রিজিম চেইঞ্জকারী এবং কোথাও অনির্বাচিত সরকারের সমর্থক ও সহায়তাকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজ-দেশে গণতন্ত্রের কী হাল হয়!

০৮/১১/২০২০
লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
x
Close